ধুর! এভাবে ভাল লাগে?
তিন মাস, ঠিক তিন মাস পর রেজাল্টটা বেরল। আর আজ,তার আরও এক মাস পর অতি কষ্টে কাউন্সেলিং হবে সল্টলেক স্টেডিয়ামে। সকাল থেকে কি হবে কি হবে চিন্তা করে শেষমেশ বেরিয়েই পরলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। পৌঁছেই একবার চারপাশে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিলাম। কাউন্সেলিংটা শুনেছিলাম বেশ গম্ভীর একটা ব্যাপার। হবে নাই না কেন? আমার মত প্রায় হাজার দেড়েক ছেলেমেয়ে এসেছে নিজেদের ‘ই-ঞ্জি-নি-য়া-র’ বানানোর তাগিদ নিয়ে।
সবাই দেখি খুব মন দিয়ে কলেজের লিস্ট দেখছে, আমিও বা বাদ যাই কেন, আমিও দেখতে বসে গেলাম। দেখছি একটা করে কলেজের সিট কমছে আর প্রতিবার চারদিক থেকে একটা চাপা আর্তনাদ ভেসে আসছে। একটা কাকিমা তো তার ২২ বছরের ছোট্টো ছেলে কে বোকেই দিল সবার সামনে।
কিন্তু কতক্ষণ আর গরমের মধ্যে এসব ভাল লাগে! ভিড়ে ঘেমে, বিরক্ত হয়ে হলঘরের কোনে রাখা একটা বেশ বড়সড় স্ট্যান্ড ফ্যানের সামনে গিয়ে সবে দাঁড়িয়েছি, হঠাৎ এক ভদ্রলোক এসে জিজ্ঞেস করলেন,
– “কত র্যাঙ্ক অবধি ডাকা হয়েছে কলেজ বাছাইয়ের জন্যে ”?
মনে মনে ভাবলাম, গোটা হলে কি আমিই ছিলাম একা জিজ্ঞেস করার জন্যে?
যাই হোক, ভদ্রলোক কে বললাম,
– “৩০০ র্যাঙ্ক অবধি ডাকা হয়েছে, কাকু”।
‘কাকু’ ডাক শুনে ভদ্রলোক বেশ খুশি হলেন মনে হল। হাল্কা হাসি দিয়ে, আরও কয়েকটা প্রশ্ন করে পাশেই একটা চেয়ারে গিয়ে বসলেন। যদিও আমি জানতে পারলাম না, আমার সদ্য পাতানো কাকু কার সাথে এই আসরে এসেছেন, কৌতূহল হল কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না আর।
তবে আসার ‘কারণ’টা জানতে বেশিক্ষণ লাগল না। ‘কারণ’ নিজেই তাঁর কাছে এসে দাঁড়াল। কলেজ লিস্ট দেখার সময় লক্ষ্য করছিলাম একটি মেয়ে আসতে না আসতেই হন্তদন্ত করে ছুটছে বাথরুমের দিকে। হাসি পেয়েছিল ওর ওই রকম ‘তাড়া-ভরা’ মুখ দেখে। কি হয়েছিল, সেটা জানার ইচ্ছেটা যদিও চেপেই রাখতে হয়েছিল তখন।
সেই মেয়েটাই দেখি কাকু-র পাশে এসে ক্লান্ত চোখে জিজ্ঞেস করল,
– “কত দূর ডেকেছে গো, বাবা”?
এইবার বুঝলাম, এ তাহলে এই ভদ্রলোকের কন্যা। কলাপাতা রঙের একটা কুর্তি পরা, মাঝারি গায়ের রঙের মধ্যে তেমন খারাপ দেখতে নয়। তবে বাথরুম গিয়েও মনে হয় তার অশান্তি কাটেনি। টানা-টানা চোখ দুটো বাদ দিয়ে তার বাকি মুখটা যেন কেমন একটা চাপা বিতৃষ্ণায় কুঁচকে গেছে।
অনেক ক্ষণ হয়ে গেল, আমিও বসে আছি,ওরাও বসে আছে একটু দূরে। কিছুক্ষন পরেই ডাক পড়ল একে একে আমাদের কলেজ বাছাইয়ের জন্যে। হলে ঢোকার আগে শেষ বার চেয়ে দেখলাম আমার পাতানো কাকু আর তাঁর মেয়ের দিকে। আমি গিয়ে কলকাতার নামকরা কলেজ – হেরিটেজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি – বেছে নিলাম, তবে সে কোন কলেজ বাছল তা আমার কাছে অজানাই রয়ে গেল…
